Dhaka ০৪:৩২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম:
জিরো টলারেন্স নীতিতে বিএনপির হাইকমান্ড রাজনৈতিক পরিচয়ে বৈষম্য নয়, ৪৯ বিসিএসের ৪৬ জনের প্রজ্ঞাপন সোমবার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আল-হাইআতুল উলয়ায় ৪ পদে জনবল নিয়োগ, আবেদন ২০ অক্টোবর পর্যন্ত ইসলামী মূল্যবোধ ও স্বাধীনতা রক্ষায় নতুন পরিষদ গঠিত ‘ক্লিন হার্ট’-এর আদলে নতুন সাঁড়াশি অভিযান, অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত বেফাকের তত্ত্বাবধানে মোহাম্মদপুরে কওমি মাদরাসায় শাস্তি প্রতিরোধে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কর্মশালা ৭ দশকের সঙ্গীকে হারালেন মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ ছাত্র আন্দোলনের মুখে আরও এক দেশের প্রধানের পদত্যাগ ভারতে ঐতিহাসিক মসজিদ রক্ষায় হাজার মুসল্লি, বাইরে বুলডোজার নিয়ে পুলিশ নতুন প্রজ্ঞাপনে মডেল মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন যে পরিমাণ সম্মানি পাবেন

জিরো টলারেন্স নীতিতে বিএনপির হাইকমান্ড

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:৩৭:০৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
  • ২ Time View

দলীয় শৃঙ্খলা ও ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ করেছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করলে তাকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে দলটি। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর বলে গতকাল ফেনীর জনসভায়ও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই কঠোর অবস্থান নিয়েই শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগরী উত্তর বিএনপিসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটি বিলুপ্ত ও নেতা-কর্মীদের বহিষ্কারের মাধ্যমে কঠোর বার্তা দিয়েছেন দলটির হাইকমান্ড। অবশ্য বিএনপির এই কঠোর অবস্থানকে ইতিবাচক হিসেবে আখ্যায়িত করে সাধুবাদ জানিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সূত্র জানিয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে দখল, চাঁদাবাজি, ভাঙচুর, আধিপত্য বিস্তারসহ নানা অভিযোগে দলের কতিপয় নেতা-কর্মীর কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ বিএনপি হাইকমান্ড। সরকারি দলের পরিচয় ব্যবহার করে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগকে এখন শুধু ব্যক্তির অপরাধ হিসেবে দেখছেন না দলটির নীতিনির্ধারক মহল। এর সঙ্গে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি জড়িত বলে মনে করেন তারা। জুলাই গণ অভুত্থ্যানে স্বৈরশাসক আওয়ামী লীগের পতনের পর দেশের মানুষ রাজনীতির গুণগত মানোন্নয়নের প্রত্যাশা করে বিএনপিকে ক্ষমতায় এনেছে। বিএনপি মানুষের সেই আকাক্সক্ষাকে মর্যাদা দেওয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলে কোনো অপরাধীকে প্রশ্রয় দেবেন না বলেই এমপিকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে কমিটি ভেঙে দেওয়া ও বহিষ্কারের মতো কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছেন।

এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি বা দখলদারিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে বিএনপি।’ তিনি বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের অভিযোগে বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মীকে ইতোমধ্যে দল থেকে বহিষ্কার বা পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলমান। এ অভিযান আরও জোরদার করা হবে। অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। আমরা যেকোনো রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে ট্রিট করছি।’

জাতীয় অধ্যাপক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ জানান, দলের শৃঙ্খলা রক্ষায় অনিয়ম ও অপকর্মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর দলীয় চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে উদ্যোগ নিয়েছেন তাতে দেশ ও জাতির মঙ্গল হবে। ভবিষ্যতেও এসব বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যের পদত্যাগ, বিএনপির কমিটি ভেঙে দেওয়া এবং বহিষ্কারের ঘটনায় বোঝা যায় দলীয় হাইকমান্ডের কাছে তাদের অনিয়মের তথ্য রয়েছে। যারা অনিয়ম করেছে তাদের সমর্থন দেওয়া সঠিক নয়। আমি মনে করি, দলীয় হাইকমান্ড যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা সঠিক। আইনশৃঙ্খলা এবং দেশের স্বার্থে এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।’

বিএনপির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষমতায় আসার সাত মাসেই নানা জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের আলাদা ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা করছে বিএনপি সরকার। কিন্তু এরই মধ্যে দলের কিছু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলদারি, সন্ত্রাস ও নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত এসব অভিযোগের খবর প্রকাশ পাওয়ায় একদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও আলোচনা বাড়ছে।

এ পরিস্থিতিতে দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় কঠোর অবস্থান গ্রহণের বার্তা দিয়েছেন দলের হাইকমান্ড। বিশেষ করে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভাঙচুর, লুটপাট ও দখলের ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি জড়িত থাকার অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে গতকাল পদত্যাগ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী খোঁজখবর নিয়ে অভিযোগ সত্য প্রমাণ হওয়ায় তাঁকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি আগের দিন ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগরী উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। একই দিনে ঢাকা মহানগরী উত্তর যুবদল এবং ঢাকা মহানগরী পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়। পাশাপাশি বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। অনৈতিক, সাংগঠনিক শৃঙ্খলাবিরোধী ও দলবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় দল থেকে তাঁদের বহিষ্কার করা হয়েছে।

যদিও কমিটি বিলুপ্তির আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা-ভাঙচুরের কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি, বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে এ সিদ্ধান্তের যোগসূত্র থাকতে পারে। এর আগে ২৯ সেপ্টেম্বর পল্লবীর ৯১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মোফিজুর রহমান মামুনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে ‘অনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগের কথা বলা হয়। এসব ঘটনায় দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে দেশজুড়ে। বিষয়টি এখন শুধু বিএনপির অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সারা দেশে টক অব দ্য কান্ট্রিতে রূপ পায়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এসব ঘটনাকে সরকারের জন্য ‘অশনিসংকেত’ আখ্যা দিয়ে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সারা দেশে দলের আত্মশুদ্ধিমূলক অভিযান চালানোর আহ্বান জানিয়েছিল।

বিএনপির সূত্র জানায়, এসব অভিযোগের পর শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে পুরো সাংগঠনিক কাঠামোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঢাকা মহানগরী উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্তির পাশাপাশি যুবদল ও ছাত্রদলের দুটি কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদেরও বহিষ্কার করা হয়েছে। এটিকে সংগঠনে শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মূলত একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাইছে-দলীয় পদ বা পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ালে সাংগঠনিক পরিচয় সুরক্ষা দেবে না।

বিএনপি এখন ক্ষমতাসীন দল হওয়ায় দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের রাজনৈতিক প্রভাবও আগের তুলনায় বেশি। বিরোধী অবস্থানে থাকা দলের নেতা-কর্মীদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড যেমন দলীয় ভাবমূর্তির প্রশ্ন তৈরি করে, ক্ষমতাসীন দলের ক্ষেত্রে একই ধরনের ঘটনা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা এবং সরকারের ভাবমূর্তির সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়। এ কারণে বিএনপির হাইকমান্ডের সামনে দুটি সমান্তরাল চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একদিকে দলীয় নেতা-কর্মীদের রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় রাখা, অন্যদিকে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যাতে দখল, চাঁদাবাজি কিংবা প্রভাব বিস্তার করতে না পারে তা নিশ্চিত করা। এজন্য দলীয়ভাবে সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনিভাবেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

About Author Information

hsnalmahmud

জিরো টলারেন্স নীতিতে বিএনপির হাইকমান্ড

জিরো টলারেন্স নীতিতে বিএনপির হাইকমান্ড

Update Time : ১২:৩৭:০৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬

দলীয় শৃঙ্খলা ও ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ করেছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করলে তাকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে দলটি। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর বলে গতকাল ফেনীর জনসভায়ও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই কঠোর অবস্থান নিয়েই শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগরী উত্তর বিএনপিসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটি বিলুপ্ত ও নেতা-কর্মীদের বহিষ্কারের মাধ্যমে কঠোর বার্তা দিয়েছেন দলটির হাইকমান্ড। অবশ্য বিএনপির এই কঠোর অবস্থানকে ইতিবাচক হিসেবে আখ্যায়িত করে সাধুবাদ জানিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সূত্র জানিয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে দখল, চাঁদাবাজি, ভাঙচুর, আধিপত্য বিস্তারসহ নানা অভিযোগে দলের কতিপয় নেতা-কর্মীর কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ বিএনপি হাইকমান্ড। সরকারি দলের পরিচয় ব্যবহার করে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগকে এখন শুধু ব্যক্তির অপরাধ হিসেবে দেখছেন না দলটির নীতিনির্ধারক মহল। এর সঙ্গে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি জড়িত বলে মনে করেন তারা। জুলাই গণ অভুত্থ্যানে স্বৈরশাসক আওয়ামী লীগের পতনের পর দেশের মানুষ রাজনীতির গুণগত মানোন্নয়নের প্রত্যাশা করে বিএনপিকে ক্ষমতায় এনেছে। বিএনপি মানুষের সেই আকাক্সক্ষাকে মর্যাদা দেওয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলে কোনো অপরাধীকে প্রশ্রয় দেবেন না বলেই এমপিকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে কমিটি ভেঙে দেওয়া ও বহিষ্কারের মতো কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছেন।

এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি বা দখলদারিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে বিএনপি।’ তিনি বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের অভিযোগে বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মীকে ইতোমধ্যে দল থেকে বহিষ্কার বা পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলমান। এ অভিযান আরও জোরদার করা হবে। অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। আমরা যেকোনো রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে ট্রিট করছি।’

জাতীয় অধ্যাপক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ জানান, দলের শৃঙ্খলা রক্ষায় অনিয়ম ও অপকর্মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর দলীয় চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে উদ্যোগ নিয়েছেন তাতে দেশ ও জাতির মঙ্গল হবে। ভবিষ্যতেও এসব বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যের পদত্যাগ, বিএনপির কমিটি ভেঙে দেওয়া এবং বহিষ্কারের ঘটনায় বোঝা যায় দলীয় হাইকমান্ডের কাছে তাদের অনিয়মের তথ্য রয়েছে। যারা অনিয়ম করেছে তাদের সমর্থন দেওয়া সঠিক নয়। আমি মনে করি, দলীয় হাইকমান্ড যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা সঠিক। আইনশৃঙ্খলা এবং দেশের স্বার্থে এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।’

বিএনপির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষমতায় আসার সাত মাসেই নানা জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের আলাদা ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা করছে বিএনপি সরকার। কিন্তু এরই মধ্যে দলের কিছু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলদারি, সন্ত্রাস ও নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত এসব অভিযোগের খবর প্রকাশ পাওয়ায় একদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও আলোচনা বাড়ছে।

এ পরিস্থিতিতে দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় কঠোর অবস্থান গ্রহণের বার্তা দিয়েছেন দলের হাইকমান্ড। বিশেষ করে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভাঙচুর, লুটপাট ও দখলের ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি জড়িত থাকার অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে গতকাল পদত্যাগ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী খোঁজখবর নিয়ে অভিযোগ সত্য প্রমাণ হওয়ায় তাঁকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি আগের দিন ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগরী উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। একই দিনে ঢাকা মহানগরী উত্তর যুবদল এবং ঢাকা মহানগরী পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়। পাশাপাশি বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। অনৈতিক, সাংগঠনিক শৃঙ্খলাবিরোধী ও দলবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় দল থেকে তাঁদের বহিষ্কার করা হয়েছে।

যদিও কমিটি বিলুপ্তির আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা-ভাঙচুরের কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি, বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে এ সিদ্ধান্তের যোগসূত্র থাকতে পারে। এর আগে ২৯ সেপ্টেম্বর পল্লবীর ৯১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মোফিজুর রহমান মামুনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে ‘অনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগের কথা বলা হয়। এসব ঘটনায় দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে দেশজুড়ে। বিষয়টি এখন শুধু বিএনপির অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সারা দেশে টক অব দ্য কান্ট্রিতে রূপ পায়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এসব ঘটনাকে সরকারের জন্য ‘অশনিসংকেত’ আখ্যা দিয়ে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সারা দেশে দলের আত্মশুদ্ধিমূলক অভিযান চালানোর আহ্বান জানিয়েছিল।

বিএনপির সূত্র জানায়, এসব অভিযোগের পর শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে পুরো সাংগঠনিক কাঠামোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঢাকা মহানগরী উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্তির পাশাপাশি যুবদল ও ছাত্রদলের দুটি কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদেরও বহিষ্কার করা হয়েছে। এটিকে সংগঠনে শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মূলত একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাইছে-দলীয় পদ বা পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ালে সাংগঠনিক পরিচয় সুরক্ষা দেবে না।

বিএনপি এখন ক্ষমতাসীন দল হওয়ায় দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের রাজনৈতিক প্রভাবও আগের তুলনায় বেশি। বিরোধী অবস্থানে থাকা দলের নেতা-কর্মীদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড যেমন দলীয় ভাবমূর্তির প্রশ্ন তৈরি করে, ক্ষমতাসীন দলের ক্ষেত্রে একই ধরনের ঘটনা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা এবং সরকারের ভাবমূর্তির সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়। এ কারণে বিএনপির হাইকমান্ডের সামনে দুটি সমান্তরাল চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একদিকে দলীয় নেতা-কর্মীদের রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় রাখা, অন্যদিকে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যাতে দখল, চাঁদাবাজি কিংবা প্রভাব বিস্তার করতে না পারে তা নিশ্চিত করা। এজন্য দলীয়ভাবে সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনিভাবেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।