শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে সম্প্রতি দেওয়া রাষ্ট্রপতির একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম সমাজ ও বিভিন্ন ইসলামী দল তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘পৃথিবীতে যখন অন্যায়-অত্যাচার, নেমে এসেছিল, তখনই দেবী দুর্গার আবির্ভাব হয়েছিল; অন্যায়-অচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই দুর্গাপূজার মূল দর্শন।’
রাষ্ট্রপতির এই মন্তব্যকে ইসলামের মৌলিক তাওহিদি বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক এবং মুসলমানদের ঈমানি অনুভূতিতে চরম আঘাত হিসেবে আখ্যায়িত করেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী আইন সংরক্ষণ পরিষদ এবং ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্স। সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতারা অবিলম্বে এই বক্তব্য প্রত্যাহার করে জাতির কাছে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্য ও প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি রাজধানীর রামকৃষ্ণ মিশন পরিদর্শন ও মতবিনিময় সভায় রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, হিন্দু ধর্মমতে পৃথিবীতে যখন অন্যায়, অত্যাচার ও নিপীড়ন নেমে এসেছিল, তখনই দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটেছিল। এ দেশে বারবার অসুরের আবির্ভাব হয়েছে এবং বাংলাদেশের মানুষ তাদের পরাজিত করেছে। তিনি সবাইকে শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, অন্যায়, অত্যাচার, অসততা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং তা পরাজিত করাই দুর্গাপূজার মূল দর্শন।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া
রাষ্ট্রপতির মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিববুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব আল্লামা শায়েখ সাজিদুর রহমান যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন।
বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তির বক্তব্যে বিশেষ দায়িত্বশীলতা ও সতর্কতা থাকা প্রয়োজন। ইসলামের মৌলিক আকিদা অনুযায়ী, মহান আল্লাহ তাআলাই সমগ্র বিশ্বজগতের একমাত্র স্রষ্টা, পালনকর্তা ও রক্ষাকর্তা। কোনো দেব-দেবীকে সমগ্র পৃথিবীর ত্রাণকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করা ইসলামের তাওহিদি বিশ্বাসের পরিপন্থী। অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে গিয়ে নিজ ধর্মের মৌলিক আকিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বক্তব্য দেওয়া বা তাতে সমর্থন জানানো সমীচীন নয়। তাঁরা রাষ্ট্রপতিকে সংশ্লিষ্ট বক্তব্য প্রত্যাহার এবং এর যথাযথ ব্যাখ্যা দেওয়ার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের বক্তব্য
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ এক বিবৃতিতে বলেন, অন্য ধর্মাবলম্বীদের অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব; কিন্তু সম্প্রীতির নামে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের সঙ্গে আপস করার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে মুসলমানদের ঈমানি মূল্যবোধে আঘাত করেছে। সব ধর্মের মানুষের নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার থাকলেও অন্য ধর্মের বিশ্বাসকে ইসলামের দৃষ্টিতে সত্য বলে স্বীকৃতি দেওয়া এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। এই পার্থক্য উপেক্ষা করে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার পরিণতি থেকে নেতৃত্বের শিক্ষা নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের পাশাপাশি সরকার ও দলের কতিপয় নেতার বিভিন্ন মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানান। তিনি বলেন, পবিত্র কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী সকল দেব-দেবী মিলে একটি মাছি বানাতেও সক্ষম নয়। দেব-দেবীরা মানুষেরই বানানো মূর্তি এবং তারা কারো উপকার বা অপকারের মালিক নয়।
তিনি আরও বলেন, নবী-রাসূলদের অবদানকে অস্বীকার করে যারা দেব-দেবীকে ক্ষমতাবান মনে করে, তাদের ঈমান থাকতে পারে না। বাংলাদেশের মতো ৯২ শতাংশ মুসলমানের দেশের রাষ্ট্রপতির মুখে এ ধরনের অসত্য ও কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বক্তব্যে জাতি হতবাক হয়েছে। সনাতনীদের ভোট কালেকশন বা খুশি করতে গিয়ে শিরিকি বক্তব্য না দেওয়ার জন্য তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের উদ্বেগ
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি শায়খুল হাদিস মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক এক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির বক্তব্যে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা ও সাংবিধানিক দায়িত্বশীলতার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
তিনি বলেন, কোনো দেব-দেবীকে সমগ্র পৃথিবীর ত্রাণকর্তা বা রক্ষাকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করা ইসলামের মৌলিক তাওহিদি বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ধর্মীয় সম্প্রীতির নামে কোনো ধর্মের মৌলিক বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তিনি রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের সংশ্লিষ্ট অংশ পুনর্বিবেচনা করে তা প্রত্যাহার এবং সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়ার দাবি জানান।
ইসলামী আইন সংরক্ষণ পরিষদের অবস্থান
ইসলামী আইন সংরক্ষণ পরিষদের নির্বাহী সভাপতি মুফতী আবদুল্লাহ ইয়াহইয়া খুলনার বিশিষ্ট উলামায়ে কেরামের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় বলেন, ধর্মীয় বিশ্বাস ও আকিদার বিষয়গুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল। ইসলামী আকিদা অনুযায়ী, মহান আল্লাহ তাআলাই সমগ্র জগতের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, প্রকৃত রক্ষাকর্তা ও ত্রাণকর্তা।
তিনি বলেন, একজন মুসলিমের জন্য এ ধরনের বক্তব্য ঈমান বিধ্বংসী ও ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাত। তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকারকে সাধুবাদ জানান, তবে ভুল স্বীকার করে অবিলম্বে বক্তব্য সংশোধনের আহ্বান জানান।
ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের দাবি
ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের মুখপাত্র মুফতি রফিকুল ইসলাম আইনী এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের রাষ্ট্রপতির মুখ থেকে এ ধরনের বক্তব্য দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ঈমানি অনুভূতিতে গভীর আঘাত করেছে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রতিনিধি নন; তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত। ইসলাম অন্য ধর্মাবলম্বীদের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিক্ষা দিলেও অন্যের প্রতি সম্মান দেখানোর নামে ইসলামের মৌলিক আকিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বক্তব্য মেনে নেওয়া যায় না। অবিলম্বে বক্তব্য প্রত্যাহার না করা হলে দেশের আলেম-ওলামা ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদ জানাতে বাধ্য হবেন বলে তিনি সতর্ক করেন।
Reporter Name 



















