যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে তুরস্ক ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথক ফোনালাপ করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, দ্বিপক্ষীয় বিষয় এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে এসব আলোচনায় কথা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিও নিউজ।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এবং সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন আরাগচি।
আইআরআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তেহরানের ভাষ্য অনুযায়ী, এই নিরাপত্তাহীনতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড দায়ী।
ফোনালাপের সময় হরমুজ প্রণালির আশপাশে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বাহিনীর মধ্যে জাহাজকে কেন্দ্র করে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে। এতে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জাহাজে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের হামলা
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, শনিবার ইরানের তিনটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এর মধ্যে একটি জাহাজে খার্গ দ্বীপের কাছে হামলা চালানো হয়। খার্গ দ্বীপ ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
এর আগে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) দুটি মার্কিন নৌযান লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে দাবি করে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেন, মার্কিন জাহাজে হামলা চালালে ইরানকে আরও বড় অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হবে। তিনি দাবি করেন, ইরানের তিনটি জাহাজে হামলা সেই বার্তারই অংশ।
অন্যদিকে আরও পাল্টা হামলার হুমকি দিয়েছে আইআরজিসি। ইরানি বাহিনী দাবি করেছে, তারা হরমুজ প্রণালিতে তিনটি তেলবাহী ট্যাংকার এবং অন্যান্য এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে।
ইরানি সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে সন্দেহজনক বা অনুমোদনহীন চলাচল থেকে জাহাজগুলোকে বিরত থাকার সতর্কতা দিয়েছে। তবে এসব হামলায় কোনো মার্কিন সেনা আহত হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম জানিয়েছে, খার্গ দ্বীপের কাছে নোঙর করা একটি ট্যাংকারে চারটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটেনি এবং জাহাজটির ক্রু সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানানো হয়।
মার্কিন ড্রোন নৌযানে হামলার দাবি
এর আগে আইআরজিসি দাবি করে, তাদের নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালির একটি সুরক্ষিত এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করা যুক্তরাষ্ট্রের একটি দূরনিয়ন্ত্রিত ড্রোন নৌযানে হামলা চালিয়েছে।
আইআরজিসি বলেছে, কৌশলগত এই জলপথ ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘শত্রুতামূলক’ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেছে তারা।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ওই দাবির বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার
সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও আরাকচির তুরস্ক ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপকে আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে আসছে। অন্যদিকে সৌদি আরবও উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে উত্তেজনা কমাতে আগ্রহী।
তবে ফোনালাপে নির্দিষ্ট কী প্রস্তাব বা উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তা প্রকাশ করেনি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আইআরআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনায় আঞ্চলিক পরিস্থিতি, দ্বিপক্ষীয় বিষয় এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার কূটনৈতিক প্রচেষ্টাই গুরুত্ব পেয়েছে।
খার্গ দ্বীপ নিয়ে উদ্বেগ
সাম্প্রতিক হামলার পর ইরানের তেল অবকাঠামো, বিশেষ করে খার্গ দ্বীপ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল খার্গ দ্বীপ দিয়ে রপ্তানি করা হতো।
এপ্রিলের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানিতে অবরোধ আরোপের পর থেকেই তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। এর মধ্যে খার্গ দ্বীপে হামলার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ আরও বাড়তে পারে।
এর আগে শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৬ দশমিক ২৮ ডলারে পৌঁছায়, যা ২৪ জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাই দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ক্যালেন্ডারঅ্যাপ বাছুন
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ঐতিহাসিকভাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এই জলপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে তা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
Reporter Name 


















