সাহিত্যকথন
রাজনীতিক ও রাজনীতিবিদ
আগে ‘রাজনীতি’ শব্দটা ভেঙে বুঝে নিই। রাজা+র+নীতি=রাজনীতি। এটা রাজহাঁসের মতো নয়, ঠিক তার উলটো। কারণ রাজহাঁস মানে রাজার হাঁস নয়, বরং হাঁসের রাজা। তাহলে হাঁসের রাজা=রাজহাঁস, পথের রাজা=রাজপথ—কিন্তু রাজার নীতি=রাজনীতি, রাজার ধানী=রাজধানী। ধানী মানে ঠাঁই বা স্থান।
প্রশ্ন হল, রাজ+নীতি কেন নয়; রাজা+র+নীতি কেন, রাজা শব্দের শেষের ‘আ-কার’ এবং তার পরের ‘র’ গেল কোথায়? উত্তর হল, শব্দটা ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাসে গঠিত। এই সমাসের নিয়ম হল, যে-দুই শব্দের মধ্যে সমাস বা মিলন ঘটে, সেগুলোর মাঝখানের ‘র/এর’ বাদ পড়ে এবং প্রথম শব্দ ‘রাজা’ হলে তা ‘রাজ’ হয়ে যায়। এভাবেই রাজার পুত্র রাজপুত্র, রাজার কন্যা রাজকন্যা, রাজার কর্ম রাজকর্ম, রাজার কুমার রাজকুমার, রাজার কোষ রাজকোষ, রাজার তন্ত্র (মতবাদ) রাজতন্ত্র, রাজার কবি রাজকবি, রাজার দরবার রাজদরবার, রাজার বন্দি রাজবন্দি, রাজার সভা রাজসভা, রাজার হস্তী রাজহস্তী এবং রাজার নীতি রাজনীতি। কিন্তু এর উলটো, রাজার হাঁসের বদলে হাঁসের রাজা রাজহাঁস হয়েছে, কারণ নিয়ম বলে, পরের শব্দ ‘রাজা’ হলে তা আগে চলে আসে। এভাবেই পথের রাজা রাজপথ, মিস্ত্রির রাজা রাজমিস্ত্রি, বাড়ির রাজা রাজবাড়ি। আগেকার দিনে রাজারা হাতি পুষতেন বলে রাজার হস্তী রাজহস্তী হয়েছে, যদি সেভাবে হাঁসও পুষতেন তবে রাজার হাঁস রাজহাঁস হতে পারত; আগেকার রাজারা কবি পুষতেন বলে রাজার কবি রাজকবি হয়েছে, যদি সেভাবে মিস্ত্রিও পুষতেন তবে রাজার মিস্ত্রি রাজমিস্ত্রি হতে পারত। লক্ষণীয়ভাবে তেমনটি ঘটে নি বলেই ধরা হয় না, অবশ্য আপনি যদি মনে মনে তা ঘটিয়ে ফেলেন, গল্পের রাজাকে দিয়ে হাঁস পালন করান, তাহলে ওই সমাসের ব্যাসবাক্য হাঁসের রাজার বদলে রাজার হাঁস ধরে নিতে পারেন।
এ গেল ‘রাজনীতি’ শব্দ ভেঙে বের করা মূল অর্থ। কিন্তু প্রসঙ্গত বক্তব্য যে, সেই রাজতান্ত্রিক/সামন্ততান্ত্রিক বাঙ্গালা মুলুকের এই অর্থ আর আজকালকার গণতান্ত্রিক বাংলায় কেজো নয়। আজ রাজ মানে হয়েছে রাষ্ট্র, রাজনীতি মানে রাষ্ট্রের নীতি কিংবা দলবিশেষের রাষ্ট্রপরিচালনার নীতি।
এবার দেখা যাক ‘রাজনীতিক’ শব্দটা তৈরি হল কীভাবে, এবং ‘রাজনীতিবিদ’-এর সঙ্গে তার তফাতটা কোথায়।
রাজনীতি+ক=রাজনীতিক। এই ‘ক’ হল, ব্যাকরণের ভাষায়, প্রত্যয়—সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয়। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (ভাষা-প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ) লিখেছেন—স্বার্থে, এবং সংযোগ জানাতে এই প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়। মুহম্মদ শহীদুল্লাহর (বাঙ্গালা ব্যাকরণ) মতে—স্বার্থে। শ্রীবামনদেব চক্রবর্তী (উচ্চতর বাংলা ব্যাকরণ) লিখেছেন—সম্বন্ধার্থে এই প্রত্যয়টির প্রয়োগ হয়। জ্যোতিভূষণ চাকী (বাংলা ভাষার ব্যাকরণ) লিখেছেন—ক (<কন্): স্বার্থে বা হ্রস্ব অর্থে বা নিন্দার্থে। এককথায় বলা যায়, প্রত্যয়টি সম্বন্ধ বা সম্পর্ক বোঝায়। যেমন অধি+ক=অধিক। ‘অধি’ হল প্রাচুর্য অর্থবোধক একটি সংস্কৃত উপসর্গ, তার সঙ্গে এই ‘ক’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে তৈরি হয়েছে (বিশেষণ) ‘অধিক’ শব্দ। পুস্ত+ক=পুস্তক। ফার্সি ‘পুস্ত্’ মানে চামড়া। সেকালে চামড়া দিয়ে বাঁধাই করা হত বলে বইয়ের নাম পড়ে গেল ‘পুস্তক’, অর্থাৎ চর্মসম্বন্ধীয় বা চর্মনির্মিত। পদ+ক=পদক।
বৈষ্ণব পদ বা পদাবলি সম্বন্ধে যিনি জ্ঞান রাখেন তাঁকে বলা হত পদক; অন্য অর্থ হল পদ বা পদমর্যাদা বাড়ায় এমন সম্মাননাবস্তু, যেমন একুশে পদক। এরকমই শশ+ক=শশক, বাল+ক=বালক, শূদ্র+ক=শূদ্রক, গতি+ক=গতিক, এক+ক=একক, ফল+ক=ফলক, নৌ+ক (স্ত্রী আ)=নৌকা। একইভাবে রাজ তথা রাষ্ট্রের পরিচালনা সম্বন্ধীয় নীতির সঙ্গে যুক্ত বিষয় বা ব্যক্তি হল ‘রাজনীতিক’। যখন ব্যক্তিকে উদ্দেশ করে শব্দটা ব্যবহার করি, তখন এর মানে দাঁড়ায় যিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, যিনি রাজনীতি করেন, রাজনীতি নিয়ে থাকেন—সেই ব্যক্তি রাজনীতিবিদ্যার পণ্ডিত হওয়া এখানে মুখ্য নয় কিংবা শর্ত নয়।
অন্যদিকে, ‘বিদ’ (বিৎ) মানে যে জানে, অভিজ্ঞ, বেত্তা, পণ্ডিত। পাণ্ডিত্য এখানে মুখ্য বা শর্ত। যেমন ভাষাবিদ, মানে ভাষার সঙ্গে সম্বন্ধ আছে এমন বোঝাচ্ছে না, এই সম্বন্ধ তো সবারই আছে; শব্দটার মানে ভাষার পণ্ডিত। মনস্তত্ত্ববিদ মানে যিনি মনস্তত্ত্ববিদ্যা হাসিল করেছেন, এ বিষয়ে বিশেষ পাণ্ডিত্য লাভ করেছেন। আইনবিদ মানে যিনি আইনবিদ্যা অধিকার করেছেন, আইনজ্ঞ। তেমনি ‘রাজনীতিবিদ’ মানে যিনি রাজনীতিবিদ্যা বা রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়ন করে বিশেষ পাণ্ডিত্য বা ডিগ্রি অর্জন করেছেন—পাণ্ডিত্য শর্ত এখানে, কার্যত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর জড়িত হওয়া শর্ত নয়।
রাজনীতিক ও রাজনীতিবিদের সরেজমিন উদাহরণ দিয়ে শেষ করি। শেখ মুজিবুর রহমান এবং জিয়াউর রহমান রাজনীতিক ছিলেন, রাজনীতিবিদ ছিলেন না। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক এবং অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ রাজনীতিবিদ ছিলেন, রাজনীতিক ছিলেন না। কিন্তু অধ্যাপক গোলাম আযম বাংলাদেশের ইতিহাসে একই সঙ্গে রাজনীতিক ও রাজনীতিবিদ দুয়েরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
──────────────
আইডিয়াল টাইমস 















