📰 আইডিয়াল টাইমস
✍️ আবুবকর বিন রাশেদ
নায়েবে মুহতামিম, মাদরাসাতুল মারওয়াহ
শুরু হয় রেখা দিয়ে, গড়ে ওঠে ভবিষ্যৎ
শিশু শিক্ষায় পরিকল্পনা, পরীক্ষা এবং ভুল বোঝাবুঝির চ্যালেঞ্জ
শিশু শিক্ষা কি শুধু অক্ষর শেখানো?
শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার যাত্রা কখনোই সরলরৈখিক নয়। এটি একটি ধাপে ধাপে অগ্রসরমান পরিকল্পিত প্রক্রিয়া—যেখানে লক্ষ্য শুধুমাত্র ‘অ’ বা ‘ক’ শেখানো নয়, বরং একজন শিক্ষার্থীকে শেখার জন্য প্রস্তুত করে তোলা। সেই প্রস্তুতি শুরু হয় একেবারে গোড়া থেকে—যেখানে একটি রেখা, একটি বৃত্ত কিংবা একটি বিন্দু দিয়েই শুরু হয় ভবিষ্যতের অক্ষরচর্চা।
আমরা যারা শিশুদের সঙ্গে কাজ করি, তারা জানি—এই সরলরেখাই একদিন হয়ে ওঠে ‘ক’, বক্ররেখা হয় ‘ঘ’, আর বৃত্ত হয় ‘ফ’ এর বুনিয়াদ। কিন্তু এই বাস্তবতা অনেক সময় অভিভাবকদের চোখে ধরা পড়ে না। তারা ফলাফল চান, প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করেন।
📚 পরীক্ষার ভয় নয়, আত্মবিশ্বাস গড়াই উদ্দেশ্য
আমাদের মাদরাসায়, শিশু শ্রেণি ও নার্সারিতে বাংলা, অঙ্ক, ইংরেজি বিষয়ে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। বাকি চারটি বিষয়ের মূল্যায়ন করা হয় মৌখিক পদ্ধতিতে। আমরা পরীক্ষাকে শিশুর জন্য ‘ভয়ের কিছু’ না বানিয়ে বরং একটি চেনাজানা অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপন করতে চাই।
প্রথম শ্রেণিতে এসে যোগ হয় সাধারণ জ্ঞান ও আরবি সাহিত্য—তাও সীমিত পরিসরে, শিশুদের মানসিক স্তর বিবেচনায় রেখে। আমরা ওদের অনুপ্রেরণা দিয়ে লিখিয়ে থাকি, যেন তারা আত্মবিশ্বাস নিয়ে পরীক্ষার খাতায় অংশ নিতে শেখে।
এই ধাপে ধাপে অভ্যস্ত করানোর প্রক্রিয়া অনেকের চোখে ধরা পড়ে না। দেখা যায়, কেউ কেউ বলেন—“ও তো লিখতেই পারছে না, অথচ পরীক্ষা হচ্ছে!” অথচ প্রকৃত চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন।
🧠 প্রতিটি রেখার পেছনে থাকে এক পরিকল্পিত দর্শন
একজন অভিভাবকের অভিযোগ আজও আমার মনে আছে।
তিনি বললেন, “উস্তাদ জ্বী আমার ছেলের খাতায় প্রতিদিন শুধু দাগ দেন, এসব কী ধরনের লেখা?”
আমি একটু হেসে তাকে বলেছিলাম—“আচ্ছা ভাই, আপনি যদি ছোট একটি চারা গাছে আজই আম কুড়াতে যান, সেটা কি সম্ভব?”
আমি তাকে বোঝালাম—আমরা প্রথমে পেন্সিল ধরার অভ্যাস গড়ি, তারপর সরল রেখা, বক্র রেখা, বৃত্ত, বিন্দু আঁকতে শিখাই। এগুলো বর্ণমালার শরীর নির্মাণে প্রথম ধাপ। এগুলো না থাকলে ‘অ’, ‘ই’, ‘ক’, ‘গ’ কখনোই আসবে না।
তাঁর চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল। তিনি বললেন, “আমি তো ভাবিইনি এতটা গভীর ভাবনা থাকে এর পেছনে!”
⚠️ ভুল তথ্যের ঝুঁকি, সম্পর্কের দূরত্ব
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক সময় অভিভাবকেরা কোনো কিছু না বুঝেই অন্যদের কাছে মত প্রকাশ করেন। সরাসরি প্রশ্ন না করে তৃতীয় পক্ষের ধারণায় ভর করে তারা ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছান। এর ফলে শুধু বিভ্রান্তি তৈরি হয় না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অভিভাবকের মধ্যকার সেতুবন্ধনও দুর্বল হয়।
একটি মন্তব্য—”আমার বাচ্চাকে চাপ দেওয়া হচ্ছে”, কিংবা
“এই বয়সে এতো পরীক্ষা?”
—এ ধরনের কথা যদি ভিত্তিহীন হয়, তবে তা শুধু এক শিশুর নয়, গোটা শিক্ষার পরিবেশকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
🤝 অভিভাবক-প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে হাঁটলেই শিশু সফল
শিশুর শিক্ষা একটি সম্মিলিত যাত্রা—যেখানে প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক এবং অভিভাবক একসঙ্গে কাজ না করলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না।
আমরা চাই, প্রতিটি অভিভাবক জানুন—প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি কার্যক্রম একটি উদ্দেশ্যপূর্ণ পরিকল্পনার অংশ।
প্রশ্ন থাকলে জিজ্ঞেস করুন। ভুল ধারণা না ছড়িয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলুন। কারণ প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর শিক্ষকের কাছে আছে।
সারকথা এক একটি রেখা, এক একটি ভিত্তিপ্রস্তর
শিশুদের হাতে আঁকা প্রতিটি রেখা যেন এক একটি ভিত্তিপ্রস্তর। আমরা সেই ভিত্তি নির্মাণে কর্মরত শ্রমিক।
প্রতিটি শিক্ষার্থী এক একটি সম্ভাবনার বীজ। সেটিকে রোপণ করতে হয় সময়, ধৈর্য এবং যত্ন দিয়ে।
তাই বলি—
শুনে নয়, আগে বুঝুন। প্রশ্ন করুন, জানুন।
কারণ প্রতিটি রেখার পেছনে থাকে সুপরিকল্পিত শিক্ষা, থাকে একটি ভবিষ্যৎ।
Reporter Name 










