জীবনের ভারসাম্য: পরিবার, কর্ম ও ব্যক্তিগত জীবনের সমন্বয়—আবুবকর বিন রাশেদ
জীবন যেন এক জটিল ধাঁধা—যার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খণ্ড হলো পরিবার, কর্ম এবং ব্যক্তিগত জীবন।
এই তিনটি দিকই আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি গড়ে তোলে। কিন্তু সবসময় এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হয় না।
আমরা অনেকেই হয়তো কর্মে সফল, কিন্তু পারিবারিক সম্পর্কে ফাটল ধরে গেছে; কিংবা পরিবারের প্রতি যত্নশীল, কিন্তু কর্মজীবনে পিছিয়ে পড়ছি। আবার কখনো নিজের ব্যক্তিগত চাহিদা, মানসিক স্বাস্থ্য, বা আত্মউন্নয়নকেই উপেক্ষিত রেখে দিন কাটছে শুধু দায়িত্ব পালনের মধ্যেই।
একটি চাকা যেমন তিনটি সমান শক্তিশালী দন্ডের উপর ঘুরে চলতে পারে, তেমনি জীবনের এই তিনটি দিকের মধ্যেও সুষম ভারসাম্য না থাকলে সেই চাকা থমকে যেতে পারে, কিংবা চলতে চলতে একসময় ভেঙে পড়ে।
পরিবার: জীবনের মজবুত ভিত্তি
পরিবার আমাদের প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ভালোবাসা ও নিরাপত্তার আশ্রয়। কর্মক্ষেত্রে আমরা যতই সফল হই না কেন, যদি পরিবারে সম্পর্ক নড়বড়ে হয়, তবে সেই সাফল্য অর্থহীন মনে হয়। সন্তানের হাসি, সঙ্গীর নির্ভরতা, মায়ের দোয়া,পরিবারের বোঝা বহনকারী বাবার কষ্টের অংশীদার হওয়া—এসব জীবনের এমন সম্পদ যা পেশাগত কোন অর্জনেও পাওয়া যায় না। তাই পরিবারকে সময় দেওয়া, কথা শোনা, পাশে থাকা—এসব কোনও বিকল্প নয়, বরং অপরিহার্য।
কর্ম: দায়িত্ব ও স্বপ্ন পূরণের উপায়
আমাদের কর্মজীবন শুধু উপার্জনের মাধ্যম নয়, বরং স্বপ্ন পূরণের পথ, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্র, এবং আত্মমর্যাদার উৎস। কিন্তু অনেকেই কর্মের সফলতার পেছনে এতটাই ছুটে যান যে, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব কিংবা নিজের মানসিক শান্তি বিসর্জন দিতে বাধ্য হন। কর্মে সফলতা অবশ্যই জরুরি, কিন্তু সেই সাফল্য যেন সম্পর্কের বা স্বাস্থ্যের মূল্য দিয়ে না আসে, সে দিকেও খেয়াল রাখা দরকার।
ব্যক্তিগত জীবন: নিজের প্রতি দায়িত্ব
আমরা প্রায়শই ভুলে যাই, নিজের যত্ন নেওয়াও এক ধরনের দায়িত্ব। আত্মবিশ্বাস, মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মউন্নয়ন—এসবই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিবার আর কর্মের মাঝে নিজেকে উপেক্ষা করলে একসময় ক্লান্তি, বিষণ্ণতা আর আত্মপ্রত্যয়ের অভাব গ্রাস করে। মাঝে মাঝে নিজের সঙ্গে সময় কাটানো, প্রিয় কোনো কাজ করা, কিংবা নিঃশব্দে কিছু সময় ধ্যান করার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নতুন করে শুরু করার শক্তি।
সমন্বয়ের শিল্প
জীবনের এই তিনটি দিকের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা কোনো সহজ কাজ নয়, বরং এটি একধরনের শিল্প। এর জন্য প্রয়োজন সচেতনতা, পরিকল্পনা, সময় ব্যবস্থাপনা, এবং সবচেয়ে বড় বিষয়—প্রাধান্য নির্ধারণ করার ক্ষমতা। কখনো হয়তো পরিবারের প্রয়োজন আগে, কখনো কর্ম, আবার কখনো নিজের মানসিক সুস্থতা। প্রতিটি মুহূর্তে নিজেকে জিজ্ঞেস করা দরকার—”আমি এখন কোন বিষয়টি প্রাধান্য দেবো? আমার সময় ও মনোযোগ কোথায় দিলে জীবনের ভারসাম্য ঠিক থাকবে?”
সারকথা,
জীবন কঠিন, কিন্তু অগোছালো হতে হবে এমন নয়। আমরা যদি পরিবার, কর্ম ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে শিখি, তবে জীবনের চাপগুলোও সামলে নেওয়া সম্ভব। একটি সুন্দর ও পরিপূর্ণ জীবনের জন্য এই সমন্বয়ই মূল চাবিকাঠি। আসুন, আমরা সচেতন হই, নিজের অবস্থান বিবেচনা করি, এবং জীবনের এই তিনটি স্তম্ভকে ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে গড়ে তুলি। কারণ একটিকে অবহেলা করলে বাকি দুইটিও টিকতে পারে না।
এই লেখা যদি আপনাকে ভাবায়, তাহলে হয়তো আপনি জীবনের ভারসাম্য খোঁজার পথে এক ধাপ এগিয়ে গেলেন।
ভাইস প্রিন্সিপাল: মাদরাসাতুল মারওয়াহ, মিরপুর-১,ঢাকা-১২১৬।
সোমবার সন্ধ্যা ৬:৫০
১৯-০৫-২০২৫
আইডিয়াল টাইমস 















