স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্তের ছাপ-আবুবকর বিন রাশেদ
প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে ছাত্ররা আসে স্বপ্ন নিয়ে। কেউ হতে চায় গবেষক, কেউ শিক্ষক, কেউ সমাজ বদলানোর কারিগর। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয় কি সত্যিই সেই স্বপ্ন পূরণের ক্ষেত্র তৈরি করছে, নাকি তা ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে এক দুঃস্বপ্নে?
সম্প্রতি ঢাবি শিক্ষার্থী সাম্য খুন হয়েছে। ঘটনাস্থল বিশ্ববিদ্যালয়ের একেবারে পাশে—যেখানে প্রতিদিন হাজারো ছাত্রছাত্রী হেঁটে যায়, প্রেম করে, ক্লাসে যায়, ক্লাস ফাঁকি দেয়, স্বপ্ন দেখে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়,এই হত্যাকাণ্ড কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি নির্মম এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যাকাণ্ড। এ ঘটনার পেছনে শুধু একজন হত্যাকারী নয়, আছে একটি অপরাধপ্রবণ, নিরাপত্তাহীন ব্যবস্থার ছায়া।
ঢাবির ছাত্ররা শুধু একাডেমিক ক্যালেন্ডার মেনে বড় হয় না। তারা বড় হয় বিক্ষোভে, প্রতিবাদে, কোর্টে, থানায়, এমনকি মর্গ বিচরণ করে। চারপাশে ঘুরে বেড়ায় পরিচিত মুখ—কখনো ক্যাডার, কখনো কোটা ভাই, আবার কখনো রাজনীতির গোপন খেলোয়াড়।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কী শিখে? উদ্ভাবন, যুক্তিবিদ্যা, গণতন্ত্র? না—সে শিখে অস্ত্রের ভাষা, রাজনৈতিক তোষামোদ, ক্ষমতার চোরাপথে টিকে থাকার কৌশল? যেখানে থাকার কথা ছিল ইনোভেশন সেন্টার, স্কিল ডেভেলপমেন্ট হাব, AI ও রোবটিক্স ল্যাব—সেখানে আছে মাদক, ছিনতাই, গ্যাং কালচার আর মৃত্যুর ছড়াছড়ি।
সাম্য ছিল একজন ছাত্র। তার নুন্যতম রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও, ক্ষমতাবান ছিল না। কিন্তু সে খুন হয়েছে এমন এক ব্যবস্থার শিকার হয়ে, যেখানে ছাত্রদের নিরাপত্তা নেই, স্বাধীনতা নেই, এবং নেই স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার সুযোগ। সাম্যের মৃত্যু শুধুই একটি জীবনের অবসান নয়—এটি হাজারো স্বপ্নের মৃত্যুর পূর্ব ইঙ্গিত। একটি ভঙ্গুর ব্যবস্থার মুখোশ উন্মোচন।
আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উত্তাল। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত চারিদিক । ছাত্রদের কন্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে “ভিসি তুই গদি ছাড়!”। ব্যানার, বিক্ষোভ, মিছিল চলছে। কেউ ডিবির সাথে ঘুরে ঘুরে দাবি করছে, “আমি অপরাধী ধরছি!” । এতো এতো নাটকের মধ্যেও হারিয়ে যাচ্ছে মূল প্রশ্নটি—বিশ্ববিদ্যালয় কি শুধু ডিগ্রি তৈরির কারখানা? এটা কি প্রকৃত মানুষ গড়ার কারখানা নয়?
আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যেন একেকটা চাপাকল। চাপে পড়ে ছাত্র ঢোকে, আর বের হয় ভীত, ক্লান্ত, রাজনীতির দাপটে জর্জরিত এক “টিকে থাকার পণ্য” হয়ে।
জাতি আশা করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আসবে দেশসেরা শিক্ষাবিদ, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক এবং মানবিক মূল্যবোধে গড়া শ্রেষ্ঠ মানুষ। কিন্তু সেই ঢাবিকে আমরা বানিয়ে ফেলেছি নেতা তৈরির কারখানা। যেখান থেকে বের হয় তোষামোদে অভ্যস্ত, সুবিধাবাদী কিছু মুখ—যাদের হাতে বইয়ের চেয়ে বেশি থাকে ব্যানার।
এখন প্রশ্ন একটাই—এই বিশ্ববিদ্যালয় আমরা কীভাবে দেখতে চাই? আরেকজন সাম্যের রক্তে ভেজা প্রাচীর, নাকি একটি মুক্ত, নিরাপদ, উদ্ভাবনী শিক্ষা পরিবেশ?
সময় এসেছে বদলে দেওয়ার। বদলা নেওয়ার সংস্কৃতির দ্বার চিরতরে রুদ্ধ করার। সিন্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে। প্রস্তুত হও নাবিক?

All reactions:
12
আইডিয়াল টাইমস 












